সন্তান জন্মদান
করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। তবে সন্তান জন্ম দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানকে
ছোট থেকে বড় করে তুলতে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। সন্তানকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত
করতে, ভালো পথে পরিচালিত করতে হলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয় এবং সন্তানের প্রতি
দায়িত্বশীল হতে হয়। পূর্বের তুলনায় বর্তমানের বাবা মায়েরা সন্তানের প্রতি বেশি
সচেতন। তারা সন্তানের লালন পালন, পড়াশুনা সবকিছু নিয়ে অধিক সচেতন। তারা চান
সন্তানকে সাফল্যের চরম শিখরে দেখতে।

সন্তান ও মায়ের কথোপকথন; Source: New Harbinger Publications

সময়ের সাথে সাথে সন্তানদের মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। হচ্ছে আবেগের পরিবর্তনও। একবিংশ শতাব্দীর বাবা মায়েরা সন্তানকে যতই ভালোবাসুক না কেন তাদের মাথায় কিছু জিনিস রাখতে হবে। ভালোবাসা ও শাসন কোনো কিছু যেন অতিরিক্ত পর্যায়ে না পৌঁছায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু তাই নয় সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে এবং সন্তানের কাছে যথাযথ সম্মানের স্থানে পৌঁছানোর জন্য আরো কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হয়। সেগুলো হলো :

শিশুকে
অবমূল্যায়ন না করা

অনেক বাবা মা আছেন যারা অনেক জ্ঞানী হওয়া সত্বেও শিশুকে অবমূল্যায়ন করে থাকেন। শিশুকে অবমূল্যায়ন করলে তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। নিজের মধ্যে থাকা সাহসের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। প্রতিটি শিশুর আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সবাই একই বিষয়ে ভালো হবে এটা ভাবা বোকামি। অন্যের ভালোটা দেখে নিজের সন্তানের সাথে তুলনা দেওয়াটাও বড় ধরনের বোকামি।

শিশুকে অবমূল্যায়ন; Source: Toluna

আপনার সন্তানের ভালো গুণাগুণ গুলোকে মূল্যায়ন করতে শিখুন। তার ছোট ছোট অর্জনকে সাধুবাদ জানান, প্রশংসা করুন। আপনার উৎসাহ ও প্রেরণা তাকে সফল করে তুলবে।

শিক্ষা জীবনের
অংশ, জীবন নয়

অনেক অভিভাবক আছেন যারা সন্তানদের উপর অনেক চাপ প্রয়োগ করেন। পড়াশোনার ব্যাপারে সন্তানদের এত চাপ প্রয়োগ করেন যার ফলে সন্তানেরা পড়াশোনার প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ে। একবিংশ শতাব্দীর বাবা মায়েদের উচিত সন্তানকে অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া। তাদের মনে রাখা উচিত পড়াশোনা জীবনের জন্য প্রয়োজন কিন্তু পড়াশোনা-ই জীবন নয়।

পড়াশোনার জন্য সন্তানকে বকা দেওয়া; Source: yourtango.com

শিক্ষার্থীরা অভিভাবকের ভয়ে নতুন বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য, পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে যার ফলে পরবর্তীতে তাদের মানসিক ক্ষতি হয়। ব্যর্থ সন্তানকে বাবা মায়েরা নানাভাবে ভয় ভীতি দেখাতে থাকে যার ফলে অনেক সন্তান আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়।

সন্তানের দুর্বলতা; Source: parentscanada.com

আপনার সন্তানের সবলতা ও দুর্বলতার জায়গা গুলো আপনি জানেন। তাই তার দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে তা অতিক্রম করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। সন্তানের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিন। কেননা সন্তানকে জোড় করে কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে এর ফলাফল ভালো হয় না।

সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিন

অভিভাবক হিসেবে আপনি আপনার সন্তানকে সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিন। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া অত্যাবশ্যকীয়। তারপর ধীরে ধীরে তাকে আচরণগত শিক্ষা দিন। পরিবার হলো শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই পরিবার থেকেই শিশুকে নৈতিকতা, মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে।

আপনি আপনার সন্তানকে ভালো আচরণ ও গুণাগুণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করুন। তাদের সামনে আপনিও সর্বদা ভালো আচরণ করুন। অন্যকে সাহায্য করা, সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা, অন্যকে সহজে বোঝার ক্ষমতা, ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেয়া ইত্যাদি গুণাগুণগুলো শিশু আপনার কাছ থেকে শিখবে। তাই উক্ত গুণাগুণগুলো প্রথমে আপনি অর্জন করুন। আপনাকে দেখেই আপনার সন্তান অনুকরণ করবে। কেননা শিশুরা অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে।

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা

আপনার শিশু সন্তানকে কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দিন। কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য চাইলে এবং সে সাহায্য পাবার পর তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার শিক্ষাও প্রদান করুন। এগুলো ভদ্রতা ও নম্রতার অংশ। তবে আপনি নিজের মধ্যে কৃতজ্ঞতা মনোভাব নিয়ে আসুন। তাহলে আপনার সন্তানের মধ্যেও এ বিষয়টি চলে আসবে।

শিশুর ধন্যবাদ জ্ঞাপন; Source: Pinterest

উন্নত দেশগুলোতে ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করা হয়। কেউ সাহায্য করলে তাকে ধন্যবাদ দেয়া হয়। যার ফলে তাদের আচরণ অনেক ভালো। তারা সবদিক থেকে সভ্য ও উন্নত। আপনার সন্তানকে যদি সঠিকভাবে গড়ে তুলতে চান তাহলে তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার শিক্ষা দিতে হবে।

সেরা বাবা মা হোন

ভুলে যাবেন না পরিবার হলো শিশুর প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র। পরিবার থেকেই শিশুরা শেখে। তাই অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের সামনে সর্বদা সত্য কথা বলুন, ভালো কাজ করুন, দুঃখীজনকে সাহায্য করুন, ধূমপান বন্ধ করুন।

সন্তানের সামনে ঝগড়া; Source: www.todaysparent.com

তার সামনে অযথা রাগারাগি, গালাগালি, বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। সর্বদা শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলুন, নরম সুরে সন্তানের সাথে কথা বলুন, পরিবার ও পরিবারের বাইরের মানুষের সাথে ভদ্রতা বজায় রেখে কথা বলুন। তাহলে আপনার সন্তানের মধ্যেও এসব গুণাবলী গড়ে ওঠবে তার অজান্তেই।

বাড়ির পরিবেশের দিকে নজর রাখুন

মানুষের সাথে পরিবেশের সম্পর্ক অনেক। শিশুর ঘরের পরিবেশ
ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন সেদিকে খেয়াল রাখুন। কারণ এসব পরিবেশ ভালো না হলে আপনার
সন্তানের মধ্যেও ভালো গুণাগুণ সৃষ্টি হবে না। আপনার সন্তান বিদ্যালয়ে গিয়ে কাদের
সাথে মেশে, তাদের আচরণ কেমন ইত্যাদি সংক্রান্ত খোঁজখবর রাখা আপনার গুরুদায়িত্ব।

খাবার ও খাদ্যাভ্যাস

শিশুকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে গড়ে তুলতে সুষম খাবার ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নেই। আপনি যদি শিশুকে সুষম খাবার খাওয়াতে চান তাহলে আগে আপনি সে খাবার গ্রহণ করুন। আপনি ফাস্টফুড খেয়ে যদি শিশুকে সবজি খাওয়ার নির্দেশ দেন তাহলে সে তা মানবে না। সুঅভ্যাসগুলো আপনি আগে শুরু করুন। তারপর সন্তানের ওপর প্রয়োগ করুন।

Featured Image Source: Maui Family Magazine

লেখক – Rikta Richi

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here