কৈশোর সময় জীবনের
একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে নানা ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়। কৈশোরে
শিশুদের মধ্যে নানা স্বভাব গড়ে ওঠে। এই স্বভাবগুলো ভালো কিংবা খারাপ হতে পারে।
সাধারণত পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা দেখতে দেখতে শিশু বড় হয়। সঠিক ও উপযুক্ত পরিবেশ
পেলে কিশোরেরা ইতিবাচক মনোভাবের হয়ে থাকে। নেতিবাচক পরিবেশ কেবলই তার ভেতরে
অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। সে পৃথিবীর বুকে নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করে। তার
মাথায় হানা দেয় হাজার বিষণ্নতা ও দুঃখবোধ।

যেভাবে
কৈশোরকালীন সমস্যা সমাধান করবেন

কৈশোর কালীন অবস্থা কিশোর কিশোরী এবং তাদের বাবা মায়ের জন্য একটি জটিল সময়। এ সময় নিজেকে শান্ত রাখা এবং সে অনুসারে কাজ করে যাওয়া প্রয়োজন। কৈশোরে কিশোর কিশোরীদের নানা সমস্যা দেখা দেয়। আর এই সমস্যাগুলো দূর করার জন্য অভিভাবককে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়।

শারীরিক পরিবর্তন

কৈশোরে ছেলে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। দৈহিক গড়ন পরিবর্তনের মুখ্য সময় এটি। এ সময় কিশোরীরা যেমন লম্বা হয় তেমনি তাদের সার্বিক গঠন বৃদ্ধি পায়। মেয়েদের স্তন বৃদ্ধি পায়, ঋতুকালীন পরিবর্তন সাধিত হয়।

কিশোরী; Source: Healthy Families BC

ছেলেদের গলার স্বরের পরিবর্তন হয়, কেমন যেন একটা পুরুষালী ভাব আসতে থাকে তাদের মধ্যে, হালকা হালকা গোঁফ দাড়ি উঠতে থাকে, ত্বকে ব্রণ, পিম্পল, র‍্যাশ ইত্যাদি ওঠে, শরীরের গন্ধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইত্যাদি। ছেলে মেয়েরা নিজেদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে নিজেরা অনেকটা বিভ্রান্তিতে থাকে, সঙ্কোচে থাকে। এ সময় তাদের মানসিক সমর্থন প্রয়োজন। কেবল অভিভাবকদের সমর্থনই পারে তাদের সহনশীল ও স্বাভাবিক করতে।

সমাধান

ছেলে মেয়েদের
শারীরিক পরিবর্তনের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আগে থেকে তাদের জানানো উচিত। কৈশোরে পা
রাখার সাথে সাথে সচেতন অভিভাবকের উচিত এসব বিষয় সম্পর্কে তাকে জানানো। যেন হঠাৎ
পরিবর্তন হলে সে শঙ্কিত না হয়। তাকে বোঝাতে হবে এ পরিবর্তনগুলো প্রাকৃতিক। সবার
জীবনে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তাই এ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়ার কিছু নেই। ছেলে
মেয়েকে এসব বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
শারীরিক ব্যায়ামের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

আবেগীয় পরিবর্তন

কৈশোরে ছেলে মেয়েদের হরমোনজিনিত পরিবর্তনের সাথে সাথে আবেগীয় পরিবর্তন হয়। এ সময়ে তারা আবেগের বন্যায় ভাসে। তাদের মধ্যে প্রচণ্ড রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, অভিমান বাসা বাধে। তারা নিজেরা বুঝতে পারে না তারা কি যুবক নাকি শিশু।

আবেগপ্রবণ কিশোর; Source: Help Your Teen Now

তাদের দায়িত্ব হলো যুবকদের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করা কিন্তু তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও আচরণ হলো বাচ্চাসুলভ। তাদের আবেগের তীব্রতা এত প্রকট থাকে যে খুব সাধারণ বিষয় তাদের আনন্দকে বাড়িয়ে দিতে পারে, খুব সাধারণ দুঃখ তাদেরকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিতে পারে।

ছেলেরা উচ্চ
স্বরে গান শুনতে ভালবাসে, বাইরে চলাফেরা করতে বেরিয়ে পড়ে, চুলের স্টাইল ও ফ্যাশন
সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়। তাদের মধ্যে ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা গড়ে
ওঠে। তারা কিছুটা লাপাত্তা স্বভাবের হয়ে যায়।

সমাধান

কিশোর কিশোরীদের
আবেগের মাত্রা কমানোর জন্য অভিভাবকের উচিত তাদের সাথে খোলাখুলি ভাবে কথা বলা,
তাদেরকে বোঝানো। অতি আবেগের ভয়াবহতা সম্পর্কেও জানানো উচিত। কাজ ও পড়াশুনার ফাঁকে
তাদেরকে সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করুন। শারীরিক ব্যায়াম, জিম, সাঁতারের প্রতি আগ্রহী
করে তুলুন।

আচরণগত সমস্যা

কৈশোরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে আচরণগত অনেক সমস্যা দেখা যায়। তারা নিজেরা ভালো ও মন্দ আচরণের পার্থক্য ভালো ভাবে জানে না। মাঝে মাঝে আবেগের বশে হিংস্র আচরণ করে ফেলে।

কিশোরীদের আচরঙত সমস্যা; Source: Pinterest

তারা যেকোনো প্রকারে নিজের একরোখা স্বভাবকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। মিথ্যা বলা কৈশোরের এক সহজাত প্রবৃত্তি। তারা বাবা মায়ের সাথে ছোট ছোট বিষয়ে মিথ্যা বলা শুরু করে। তাছাড়া জীবনযাপনে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

সমাধান

কৈশোরকালীন
আচরণগত সমস্যা নিয়ে অভিভাবককে অনেক বিপাকে পড়তে হয়। এ সময়ে ছেলেমেয়েকে শান্ত মাথায়
বোঝাতে হবে। রেগে গিয়ে তাদের প্রতি অবিচার করা যাবে না। ঠান্ডা মাথায় তাদের খারাপ
আচরণগুলো  সম্পর্কে বোঝাতে হবে। সত্য কথা
বলা এবং ভালো আচরণ করার প্রতি তাকে উৎসাহী করতে হবে। ভালো কিছু বই পড়ার ব্যাপারে,
ভালো কিছু সিনেমা দেখার ব্যাপারে উৎসাহী করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে ছেলে মেয়েরা
শিক্ষণীয় কিছু শিখতে পারবে।

শিক্ষাগত
চ্যালেঞ্জ

কিশোরে ছেলে মেয়েরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কিংবা কলেজে পড়ে। এ সময়ে পড়াশুনার প্রচণ্ড চাপ থাকে। কেউ কেউ পড়াশুনার অতিরিক্ত চাপে খুব বিরক্ত হয়ে যায় এবং পড়াশুনার প্রতি বেখেয়ালী হয়ে যায়।

পড়াশুনার চাপ; Source: Understood.org

আবার কেউ কেউ  পড়াশুনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। তবে পড়াশুনাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে সঠিকভাবে পড়াশুনা করলে ভালো ফলাফল করা যায়।

সমাধান

এ সময় পড়াশুনার
যেহেতু প্রচুর চাপ থাকে সেহেতু ঘরের কাজে তাকে বেশি সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন নেই।
অভিভাবকের উচিত ঘরের কাজগুলো নিজেরা সম্পন্ন করা এবং তাকে পড়াশুনায় সমর্থন করা। আর
পুষ্টিকর খাদ্য, ফলমূল খাওয়ার ব্যাপারে সন্তানকে আগ্রহী করে তোলা উচিত। নয়তো
অতিরিক্ত পড়ার চাপ ও ক্লান্তির কারণে ধীরে ধীরে সে দূর্বল হয়ে যাবে।

অনলাইনের প্রতি
আসক্তি

বর্তমান যুগে তথ্য প্রযুক্তি ও অনলাইনের যাবতীয় বিনোদন ব্যবস্থা একেবারে হাতের মুঠোয়। কিশোর কিশোরীরা ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ইত্যাদি নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে।

মোবাইলের প্রতি আসক্তি; Source: United Methodist Communications

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, মিউজ্যাক্যালি, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি অধিক সময় ব্যয় করার ফলে তারা জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করে ফেলে। তাছাড়া ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ে। যা তাদের জন্য ক্ষতিকর।

সমাধান

আপনার সন্তানকে সর্বদা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখুন। ইন্টারনেট ব্যবহারে তাকে মানা করবেন না। বরং কম পরিমাণে ব্যবহার করতে বলুন। পড়াশুনা ও সুন্দর জীবন সংক্রান্ত কিছু মোটিভেশনাল বক্তব্য শুনাতে পারেন কিংবা সেমিনারে নিয়ে যেতে পারেন। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সীমানা বেধে দিন।

Featured Image Source: MomJunction

লেখক – Rikta Richi

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here