টেলিভিশন বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতিটি মানুষের জীবনে টেলিভিশনের ভূমিকা রয়েছে। শিশুর জীবনেও ঠিক তাই। শিশুরা কার্টুন থেকে শুরু করে যেকোনো ভৌতিক মুভি দেখে টেলিভিশনে। এই বিষয়গুলো তারা ভীষণভাবে উপভোগ করে। টেলিভিশন থেকে শিশুরা নানা শিক্ষামূলক আচরণ, নৈতিক আচরণ শেখে। ভালো গুণাবলীও শেখে। তবে ভালো গুণাগুণের পাশাপাশি তারা নেতিবাচক দিকগুলোও রপ্ত করে ফেলে। তাই টেলিভিশনে শিশু কেমন প্রোগ্রাম দেখছে সেটি মুখ্য বিষয়।

শিশুর টেলিভিশন দেখা; Source: Scary Mommy

টেলিভিশন চরিত্রের উন্নয়ন ঘটায় এবং ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করে। পিতামাতা যদি ছোট থেকে শিশুকে টেলিভিশন দেখার প্রতি গুরুত্ব নেয় তথা কোন প্রোগ্রাম দেখবে, কোনগুলো দেখবে না তা নির্ধারণ করে দেয় এবং টেলিভিশন দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয় তাহলে শিশুকে নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।  

শিশুদের ওপর টেলিভিশনের ইতিবাচক প্রভাব

টেলিভিশন শিশুদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে উপকার করে। টেলিভিশন দেখে দেখে শিশুরা সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারে। শিশুদের উপর টেলিভিশনের ইতিবাচক প্রভাবগুলো হলো :

বিনোদন

টেলিভিশন বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিশুরা টেলিভিশন থেকে বিনোদন লাভ করতে পারে। নানা ধরনের গান, শো, কার্টুন, মজাদার অনুষ্ঠান শিশুদেরকে আনন্দে মাতিয়ে রাখে। তা থেকে তারা ইতিবাচক কিছু দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে।

শিশুর কার্টুন দেখা; Source: meenakshiworldschool.com

বিনোদনধর্মী বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখার ফলে তারা আবেগীয় ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। উপদেশমূলক কোনো প্রোগ্রাম দেখে শিশুরা নানা উপদেশ সম্পর্কে সচেতন হতে পারে এবং ডিসকভারি চ্যানেলে নানা কিছু দেখে তারা নতুন নতুন দক্ষতার সাথে পরিচিত হতে শেখে।

শিক্ষা

টেলিভিশন শিশুদের
শেখাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আপনার সন্তান যদি পড়াশুনায় মনোযোগী না হয়, তাহলে
তাকে টেলিভিশনের শিক্ষামূলক প্রোগ্রামগুলো দেখান। ধীরে ধীরে সে মনোযোগী হবে।
তাছাড়া শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম থেকে তারা ছড়া, কবিতা, নামতা, যোগ ও বিয়োগ সম্পর্কে
শিখতে পারবে। তাছাড়া বেশ কিছু কার্টুন দেখেও শিশুরা মানসিক দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা
লাভ করতে পারে।

খেলাধুলা

টেলিভিশনে খেলাধুলার বেশ কিছু প্রোগ্রাম হয়। শিশুরা খেলতে ভালোবাসে। তারা টেলিভিশনে খেলাধুলার প্রোগ্রাম দেখে বাস্তবেও খেলাধুলার প্রতি উৎসাহী হয়। ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলাধুলার পাশাপাশি অন্যান্য খেলার প্রতি আগ্রহী হয়।

কার্টুন থেকে খেলাধুলার ধারণা লাভ; Source: PunjabiCenter.com

খেলাধুলা করলে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটে। তারা কর্মঠ হয়। খেলাধুলা করার জন্য তারা বিভিন্ন বন্ধুদের সাথে মেশে। আর এর ফলে তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসার বন্ধন করে ওঠে। দয়া, মায়া, স্নেহ ও সহযোগিতা সম্পন্ন মনোভাব প্রকাশ পায়।

সংস্কৃতি
সম্পর্কে জ্ঞান

মানুষ যা কিছু
করে সেসব আচরণ, চলাফেরা, কাজ সবকিছুই সংস্কৃতির আওতাভুক্ত। তবে শিশুরা টেলিভিশন
দেখার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও চালচলন সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। অন্যান্য
দেশের মানুষের জীবন যাপন, খেলাধুলা, পোশাক, উৎসব ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারে। এসব
কিছু শিশুর মাঝে নতুনত্ব সৃষ্টি করে এবং শিশুকে নতুন নতুন চিন্তা করতে সহায়তা করে।

উদ্ভাবনী ক্ষমতা
ও সৃজনশীলতা

টেলিভিশন দেখার মাধ্যমে শিশুদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে রান্নার শো, ছবি আঁকা, ক্রাফট শো, মিউজিক শো ইত্যাদি হয়। এগুলো দেখার মাধ্যমে শিশুরা অনেক কিছু রপ্ত করতে পারে।

ছবি আঁকা; Source: Abbott Family

তারা নতুন নতুন রান্নার রেসিপি সম্পর্কে ধারণা লাভ করার পাশাপাশি ছবি আঁকা, হস্তশিল্প সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পায়।

ভালো ফলাফল

গবেষকরা বলেন, যেসব শিশুরা নিয়মিত টেলিভিশনে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল ভালো হয়। অন্যান্য সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় তাদের রেজাল্ট এগিয়ে থাকে। তাই আপনার সন্তানকে শিক্ষামূলক ও তথ্যবহুল অনুষ্ঠান দেখার প্রতি উৎসাহিত করুন।

বিষণ্ণতা দূর

শিশু কিশোরেরা নানা কারণে হতাশায় ভোগে। তাদের আবেগের গভীরতা থাকে অনেক। এইসব আবেগ কাটিয়ে ওঠার জন্য টেলিভিশন প্রোগ্রামগুলো সহায়তা করে। বিনোদনধর্মী সব প্রোগ্রাম শিশুদের বিষণ্ণতা দূর করতে সহায়তা করে এবং তাদের প্রাণচঞ্চল করে।

প্রযুক্তি ও
ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা

টেলিভিশনে নানা ধরনের প্রোগ্রাম থেকে শিশুরা নতুন নতুন প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এছাড়া ফ্যাশন, ট্রেন্ড ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারে। শিশুদের মধ্যে আবেগীয় দক্ষতার বিকাশ ঘতে এবং ভাষাগত বিকাশ ঘটে। শিশুরা বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষা শিখতে পারে।

শুধু তাই নয়, তারা সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করার ধারণাও লাভ করে টেলিভিশন দেখার মাধ্যমে। শিশুদের কার্টুনের প্রিয় চরিত্র যদি সমাজ সেবা করে, মানুষের উপকার করে তাহলে তাদের মধ্যেও সেধরনের মনোভাব জন্মলাভ করে।

শিশুদের ওপর টেলিভিশনের নেতিবাচক প্রভাব

টেলিভিশন শিশুদের
জন্য যেমন উপকারী, ঠিক তেমন অপকারীও বটে। জেনে নিন শিশুদের উপর টেলিভিশনের
নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে।

অযথা সময় নষ্ট

শিশুরা যদি
সারাদিন টেলিভিশনের পেছনে সময় ব্যয় করে তাহলে তো সময় নষ্ট হবেই। অতিরিক্ত টেলিভিশন
দেখলে পড়াশুনার ক্ষতি হবে এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেড়ে যাবে। এছাড়া অতিরিক্ত
টেলিভিশন দেখার ফলে তারা হতাশ ও আশাহীন হয়ে পড়বে। তাই আপনার সন্তানকে টেলিভিশন
দেখার নির্দিষ্ট সময় বেধে দিন।

স্থূলতা

যেসব শিশুদের অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার ঝোঁক রয়েছে, তাদের শরীর স্থূল হয়ে যায়। কারণ তারা টেলিভিশন নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকে এবং তারা হাঁটা চলা করে না।

স্থূলতা; Source: Health

খাবার খাওয়ার পর হাঁটাচলা না করলে, বাইরে না গেলে স্থূলতা বৃদ্ধি তো পাবেই। সেই সাথে অন্যান্যদের সাথে মেলামেশা করলে, খেলাধুলা না করলে শিশুরা অসামাজিক হয়ে যাবে।

হার্ট ও চোখের
স্বাস্থ্য

যেসব শিশুরা
সারাদিন টেলিভিশন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাদের হার্টের সমস্যা ও চোখের সমস্যা বেড়ে
যায়। তারা অল্প দিনেই চশমা পড়ে এবং চশমার পাওয়ার দিনকে দিন বাড়তে থাকে।

খারাপ ফলাফল

শিশু যদি পড়াশুনা না করে সারাদিন টেলিভিশন দেখে তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল খারাপ হবে এবং সে বিষণ্নতায় ভুগবে। তাছাড়া টেলিভিশন থেকে সে নেতিবাচক আচরণ শিখবে।

Featured Image Source: Mum’s Lounge

লেখক – Rikta Richi

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here