অন্যের সাথে নিজ সন্তানের তুলনা করা ভালো কাজ নয়। তুলনা করলে সন্তানের আত্মসম্মানে আঘাত হানে। অন্যের সাথে তুলনা করলে নিজের মনে অশান্তি সৃষ্টির পাশাপাশি সন্তানের মানসিক শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। কারণ অন্যেরা তাদের নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো কিছু করছে। ঐ একই সামর্থ্য ও শক্তি সবার থাকবে এটা ভাবা বোকামি। সবার সব গুণাগুণ থাকে না।

মেয়ের সাথে মায়ের অন্যের সাথে তুলনা বিষয়ক আলোচনা; Source: parenting.firstcry.com

অন্যের সাথে তুলনা করলে, অন্যের সাপেক্ষে সন্তানকে নিয়ে আলোচনা করলে সন্তান রেগে যেতে পারে, হীনমন্যতায় ভুগতে পারে এমনকি দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্থ হয়ে খারাপ কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে। কারণ শিশু কিশোরেরা আবেগপ্রবণ হয়। তারা অতিরিক্ত বকাঝকা ও শাসন মেনে নিতে পারে না।

অভিভাবক হিসেবে আপনার এসব ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। নয়তো সন্তানকে কখনো সফল হিসেবে দেখার সুযোগ পাবেন না। কেবল আপনার অনুপ্রেরণা ও উৎসাহের মাধ্যমে সন্তানকে সামনের পথে ধাবিত করতে পারবেন এবং সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারবেন।

যেসব কারণে
অভিভাবকেরা অন্যের সাথে নিজের সন্তানের তুলনা করেন

প্রতিটি বাবা মা চান সন্তান সব কাজে সফল হোক। তারা চায় সন্তান পড়াশুনায় খুব ভালো হতে, সেরা ফলাফল করতে এবং সব কাজে সফল হতে। আসলে বাবা মা সেরাটা চায় সন্তানের মঙ্গলের জন্য। তারা সন্তানকে পড়ার চাপ দেন ভালোর জন্য। অন্যের সফলতার সাপেক্ষে সন্তানের অবস্থা বা সফলতাকে তুলনা করেন ভালোর জন্য।

সন্তানের সঙ্গে রাগারাগি; Source: Depositphotos

তারা ভাবেন তুলনা করলে সন্তানের মধ্যে জেদ তৈরি হবে এবং সে পুরোদমে ভালো করার জন্য চেষ্টা করবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। বাবা মায়ের অতিরিক্ত শাসন এবং অন্যের সাপেক্ষে তুলনা করার ফলে সন্তান রেগে যায়, হতাশাগ্রস্থ হয়। সন্তানের আত্মমর্যাদাবোধ নষ্ট হয় এবং আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।

অন্যের সাপেক্ষে
সন্তানকে তুলনা করার আগে যেসব বিষয় ভাবা জরুরী

অভিভাবকেরা অন্যের সাথে সন্তানকে তুলনা করে এই ভেবে যে তুলনা করলে সুসন্তানের ইচ্ছা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। মাথায় রাখা উচিত দক্ষতা, শক্তি, সামর্থ্য সবার একরকম হয় না। তাদের বোঝা উচিত ব্যক্তিভেদে মানুষ ভিন্ন হয়। মানুষের ক্ষমতা ভিন্ন হয়। শিশুরা একে অন্যের চেয়ে আলাদা। অন্যের সাপেক্ষে সন্তানকে তুলনা করার আগে  আরো যেসব বিষয় ভাবা জরুরী তা হলো

প্রতিটি শিশু
ভিন্ন এবং তাদের ভিন্ন চিন্তাধারা রয়েছে

বাবা মা সন্তানের মঙ্গল চাইবেন এটা স্বাভাবিক। সন্তানের ভালো ও মন্দ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন তা স্বাভাবিক। তবে অন্যের সাথে তুলনা করে বারংবার সন্তানের মানসিক শক্তিকে নষ্ট করে দেয়া কারো কাম্য নয়। অভিভাবকের এটা বুঝতে হবে প্রতিটি শিশু একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন। তাদের নিজস্ব মতামত আছে। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না।

সৃজনশীল শিশু; Source: Creative Child Magazine

কেউ পড়াশুনায় ভালো, কেউ ভালো গল্প বলতে জানে, কারো হাতের লেখা খুব সুন্দর, কেউ ভালো কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ ভালো নাচতে জানে ইত্যাদি। সবাই সব বিষয়ে পারদর্শী হবে না এটাই স্বাভাবিক। একজন একটি বা দুটো বিষয়ে পারদর্শী হতে পারে। সে যে বিষয়গুলোতে ভালো নয় সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে অহেতুক মানসিক আঘাত করা বাবা মায়ের বড় ভুল।

শিশুরা শোকেসে
সাজানো কোনো পণ্য নয়

শিশুদের নিজস্ব
মানসম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। শিশুরা কোনো পণ্য নয় এটি বাবা মাকে মনে রাখতে হবে।
সামাজিক কোনো কাজ সম্পাদনে, কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য শিশুকে অতিরিক্ত
জোরাজুরি না করা ভালো। আপনি শিশুকে উৎসাহ দিতে পারেন তবে অতিরিক্ত চাপ নয়।
অতিরিক্ত চাপ শিশুকে মানসিকভাবে আঘাত দেয়। তাই তাকে যথাযথ ভালবাসা, সম্মান ও
গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অভিভাবকের উচিত সন্তানের আবেগীয় ও মানসিক দিকগুলো বিবেচনা
করা।

শিক্ষা একটি
মৌলিক অধিকার

প্রতিটি অভিভাবকের উচিত সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলা। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বাস্তবিক শিক্ষাও সন্তানকে দেয়া জরুরী। অনেক বাবা মা সবচেয়ে নামিদামি বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করিয়ে মনে করেন তার জীবন ধন্য। দামি বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করানো একটা ফ্যাশন।

সন্তানের সঙ্গে সখ্যতা; Source: creativitypost.com

সন্তানকে পড়াশুনা করানো বাবা মায়ের দায়িত্ব। তার বদলে সন্তানের কাছে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করা যাবে না। শুধুমাত্র টাকা পয়সা অর্জন ও ভালো চাকরি লাভের প্রত্যাশায় সন্তানকে পড়াশুনা করাবেন না। সন্তানকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলুন তাহলে দেখবেন সে মানুষের মতো মানুষ হয়েছে।

অন্যের সাপেক্ষে
তুলনা করার নেতিবাচক প্রভাব

অন্যের সাপেক্ষে তুলনা
করলে শিশুদের মধ্যে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।  নেতিবাচক সমালোচনাকে গ্রহণ করতে পারে না। তাদের
মধ্যে সহিংস মনোভাব, জেদ, রাগ ইত্যাদি সৃষ্টি হয়।

ভাইবোনদের সাথে
দ্বন্দ্ব

দুই ভাইবোনকে বাবা মা যদি একজনের সাথে অন্যজনের তুলনা করে তাহলে নিজের অজান্তেই উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দেয়। শিশুরা একজন অন্যজনের ভালোটা দেখতে পারে না।

সহোদরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব; Source: Families for Life

নিজের মধ্যে ঈর্ষা পরায়ণতা কাজ করে এবং যেকোনো উপায়ে অন্যজনের চেয়ে নিজেকে ভালো অবস্থানে দেখতে চায়। এর ফলে রেষারেষির সৃষ্টি হয়, পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

দূরত্ব সৃষ্টি

অভিভাবক যদি সন্তানকে অন্যের সাপেক্ষে তুলনা করা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাহলে সন্তান নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। সে নিজে থেকে বাবা মায়ের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে। নিজেকে ছোট, অলস, অকর্মণ্যভাবে। দিনকে দিন নিজের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা জমতে থাকে। তার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাগুলো ধ্বংস হতে থাকে।

প্রতিভা দমন করে

প্রতিটি শিশুর আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, রয়েছে প্রতিভা। আপনি যদি আপনার সন্তানের প্রতিভাকে মূল্যায়ন না করেন তাহলে তার প্রতিভা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাই সন্তানের প্রতিভা, কাজ ও ছোট ছোট সফলতাকে প্রশংসা করুন যেন সে কাজের স্পৃহা খুঁজে পায়।

Featured Image Source: workingmother.com

লেখক – Rikta Richi

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here