বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এ উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় হয়েছে লক্ষণীয় পরিবর্তন। এনেছে গতি ও শৌখিনতা। এর প্রভাব শিশুদের ওপরও নানাভাবে পড়ছে। উন্নত বিশ্বের শিশুদের মতো বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও বাড়ছে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা।

শিশুদের প্রযুক্তির ব্যবহার; Source: Video Blocks

তারাও ঘরে বসেই শিখতে পারছে অনেক কিছু। জানতে পারছে নতুন নতুন সব বিষয়াবলী সম্পর্কে। তাদের মেধার বিকাশ ও জীবনটাকে সহজ করার জন্য প্রযুক্তি এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আজকে আমরা প্রযুক্তির এমন কিছু ব্যবহার সম্পর্কে জানবো, যা শিশুদের জন্য অনেক উপকারী।

১. প্রযুক্তির সৃজনশীলতা শিশুদের স্বাধীনতা দেয়

বর্তমানে শিশুদের ছোট থেকেই বড় কিছু করার পরিকল্পনা থাকে৷ অতীতে তাদের যেই কল্পনাগুলো বই খাতা, খেলাধুলা ও রঙ্গিন মার্কারের আঁকিবুঁকির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেই ধারনাগুলোকে রূপান্তরিত করার জন্য এখন তাদের কম্পিউটার, ট্যাবলেট এবং এরকম আরও অনেক কিছু রয়েছে, যা এই কল্পনাগুলোকে বাস্তবতায় পরিণত করতে সহায়তা করে।

প্রযুক্তির সৃজনশীলতা শিশুদের স্বাধীনতা বাড়িয়ে দেয়; Source: Yellow Pages

যেমন প্রতিটি শিশুর কাছে এখনও কিন্তু কালার পেন এবং পেপার আছে। কিন্তু এখন তারা কম্পিউটারে একটি ছবি অঙ্কন করে তা দ্বারা 3D অ্যানিমেশন তৈরি করতে পারে এবং সেই অ্যানিমেশনটিকে 3D প্রিন্টারে পাঠাতে পারে যাতে এটি শারীরিক আকার নিতে পারে। ভাগ্যক্রমে তাদের সৃষ্টিই একটি মিলিয়ন ডলার ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।

২. সামাজিকীকরণ এবং সম্পর্ক গঠনে প্রযুক্তির ব্যবহার

প্রযুক্তি মানুষকে নতুন সম্পর্ক গঠনের জন্য সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। কারো সাথে যোগাযোগ করার এক অনন্য মাধ্যম হলো মোবাইল। এই মোবাইলও প্রযুক্তির একটি বিশেষ অংশ। এটি আপনার সন্তানকে সামাজিক করে তোলে।

কেননা যেই শিশুটি আশেপাশের মানুষকে চেনে না, পরিচিত হয় না, সেই শিশুটিই ঘরে বসে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে পরিচিত হতে পারছে, মিশতে পারছে। তার যোগাযোগ করার দক্ষতা উন্নত হওয়ার ফলে তার পরিচিতি বাড়ছে।

তাছাড়া ভিডিও গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলোর দ্বারা তারা অনেক কিছু শিখছে। নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হচ্ছে। একজনের প্রতিভা অন্যজন দেখতে পাচ্ছে এবং নিজের মধ্যে বড় হওয়ার বীজ বপন করতে পারছে।

মোটকথা প্রযুক্তি একটি শিশুকে সামাজিকভাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে৷ কিন্তু এক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিমাণ যেন অতিরিক্ত না হয়৷ যেটা শরীর, স্বাস্থ্য ও মানসিকভাবে মানুষকে অসুস্থ করে দেয়।

৩. প্রযুক্তি শিশুদের ক্ষমতায়নের অনুমতি দেয়

অভিব্যক্তি স্বাধীনতার প্রথম বিন্দু যার থেকে একটি ধারণার সৃষ্টি হয়। এই ধারণা থেকেই শুরু হয় কোনো কিছু শুরু করার চিন্তা। এর জন্য প্রথমত, আপনি কিছু করার উপাদান খুঁজে বের করেন। তারপর আপনি ভিত্তি তৈরি করেন এবং সেই জিনিসটি বা ধারণাটি আরও কিছুটা কার্যকর করেন। এবং অবশেষে আপনি কাজটা করতে পারেন অথবা প্রকৃতপক্ষে ধারণাটিকে বাস্তবায়নের জন্য পুরোদমে কাজ শুরু করেন।

প্রযুক্তির মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াটা বাচ্চারা নিজেরাই চালাতে পারে। যে কাজটি প্রযুক্তি ছাড়া করা অনেক কঠিন, সেই কাজটাকেই সহজ করে দেওয়ার জন্য প্রযুক্তির আগমন। এটা শুধুমাত্র কাজ করার জন্য নয়। এটা যথেষ্ট শান্ত কিন্তু স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের অনুভূতি।

৪. প্রযুক্তি সহজেই সমস্যার সমাধান করে

আর কয়েক যুগ আগেও মানুষকে বড় কোনো হিসেব করতে গিয়ে খাতা কলম আর নিজের মস্তিষ্ককে চাপ দিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তি আমাদের এমন একটা জিনিস উপহার দিয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই বড় বড় অংক সমাধান করতে পারি। যার নাম ক্যালকুলেটর। এক নিমিষেই বিশাল বড় হিসেব করে ফেলতে পারি ক্যালকুলেটরের বোতাম টিপেই। আজকে আমরা এত সহজভাবে হিসেব করতে পারছি শুধুমাত্র প্রযুক্তির কল্যাণে।

প্রযুক্তি সমস্যা সমাধান করে; Source: Gayhurst Community School

শুধু হিসেবের ক্ষেত্রেই নয় পড়াশোনা, যোগাযোগ, তথ্য সরবরাহ সবকিছুই মানুষ ঘরে বসে খুঁজে পাচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে। ঠিক তেমনি একটি শিশুকে পড়াশোনা থেকে শুরু করে যাবতীয় সকল বিষয়ে প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে। যেমন এখন ইন্টারনেটে শিশুদের বিভিন্ন গল্প, ছড়া, কবিতা ও লিখার নিয়ম শোখানো হয়। যা শিশুর পড়াশোনায় অনেক সাহায্য করতে পারে।

৫. প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরি করে

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা সবসময়ই এমন কাউকে তাদের আইডল মনে করে যার মতো সে হতে চায়। তারা তাদের আইডলের প্রতিটা বিষয় খেয়াল করে এবং তার মতো হওয়ার সম্পূর্ণ চেষ্টা করে। একটি শিশুর মনে এই ধরণের চিন্তার উদয় হওয়া খুবই জরুরি।

আগের দিনে মানুষ সহজে জানতেই পারতো না কি কাজে কতটা সম্মান অথবা কী করলে বড় হওয়া যাবে। কিন্তু এখন মানুষ ঘরে বসেই প্রতিটি বিখ্যাত ব্যক্তিকে দেখছে, যার মাধ্যমে তারা অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। এবং তাদের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশিত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে এক একটা প্রাণবন্ত উদ্যোক্তা।

এই উদ্যোক্তাগুলোই সহজে অনেক বড় কিছু করতে পারে। কারণ তাদের থাকে অদম্য সাহস। তারা ছোট থেকেই নিজেকে সেভাবে তৈরি করে বলে তাদের আর পিছুপা হতে হয় না।

৬. প্রযুক্তি শিখতে সাহায্য করে

সাধারণত কোনো জিনিস পড়ে শেখার চেয়ে দেখলে অনেক বেশি মনে থাকে। তাই বইয়ে পড়ে যে জিনিসটা সহজে বোঝা ও মনে রাখা সম্ভব না তা শিশুদের ভিডিও আকারে দেখান। এটি মনে রাখার একটি অন্যতম মাধ্যম।

প্রযুক্তি শিখতে সাহায্য করে; Source: Silicone Wristbands

আবার ধরুন, আপনার শিশু কিছু শিখতে বিরক্ত হচ্ছে অথবা শিখতে চাচ্ছে না। তাহলে অবশ্যই তাকে মুখে মুখে পড়ান অথবা কোনো রেকর্ড শোনান। যার মাধ্যমে তার মস্তিষ্কে সেটা সহজে প্রবেশ করবে এবং সে সহজে ভুলবে না। তাছাড়া কিছু গেমস আছে যেগুলো খেলার মাধ্যমে মেধা বাড়ে। যেমন রিউবিকস কিউব খেলার মাধ্যমে শিশু সমস্যা সমাধানের নিয়ম শিখে নেয়।

৭. প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার

যদিও প্রযুক্তি আমাদের নানাভাবে সহায়তা করে। কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহারের পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত বিপদজনক। কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো না, ঠিক তেমনি প্রযুক্তিও না। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে ভালো কিছু করার জন্য যেমন অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়, তেমনি সারাদিন অনলাইনে চ্যাটিং, স্ক্রলিং, গেমস ইত্যাদি করে প্রয়োজনীয় সময়ও নষ্ট করা যায়।

প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার; Source: hollydayschicago.com

তাই আপনার সন্তানকে এমনভাবে তৈরি করুন, যেন সে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করে এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার থেকে দূরে থাকে।

সুতরাং, প্রযুক্তির সঠিক পরিমাণে ব্যবহার আমাদের জীবনটাকে করে দিতে পারে সুন্দর সমৃদ্ধ। তাই আপনার শিশুকে ছোট থেকেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান দিন এবং এর ক্ষতিকারক দিকগুলোও জানিয়ে দিন। যাতে সে খারাপটাকে এড়িয়ে ভালোটাকে গ্রহণ করতে পারে।

Featured Image Source: 123RF.com

লেখক – Iffat Jahan

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here