প্রত্যেক বাবা মা তার সন্তানকে সুস্থ দেখতে চান। সন্তানের মুখে দূর্গন্ধ থাকুক তা কোনো বাবা মা চান না। তারা যথাসম্ভব তাদের সন্তানকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করেন। তবে শিশুরা অনেক সময় যত্নের প্রতি অবহেলা করে।

শিশুদের মধ্যে একটি খারাপ প্রবণতা দেখা যায়, আর তা হলো তারা প্রতিদিন দাঁত মাজতে চায় না। যার ফলে শিশুদের দাঁতে ক্যাভিটিস দেখা দেয় এবং মুখে দূর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। মুখে দূর্গন্ধ থাকলে একজন শিশুকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। কেননা কেউ চায় না কথা বলার সময় অন্য কারো মুখ থেকে দূর্গন্ধ বেরিয়ে আসুক।

শিশুর মুখে হাত; Source: Smart Parenting

মুখে দূর্গন্ধ হওয়ার নানা কারণ আছে। সঠিকভাবে দাঁত পরিষ্কার করা ছাড়াও রয়েছে আরো কারণ। যেমন যথেষ্ট পরিমাণে পানি না খাওয়া, অ্যালার্জি জনিত সমস্যায় ভোগা, সাইনাস কিংবা টনসিল জনিত সমস্যা, বড় কোনো রোগের প্রাথমিক পর্যায় ইত্যাদি।

ক্রনিক হেলিটোসিস

হেলিটোসিস হলো শ্বাস ফেলার সময় কিংবা কথা বলার সময় মুখ থেকে বাজে গন্ধ বের হওয়ার দীর্ঘদিনের ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে ঘটনাটা গুরুতর বলে ধরা হয়। মানুষের মুখের ভেতর নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। বিশেষ করে জিহ্বার ভেতরের দিকে অনেক ব্যাকটেরিয়া থাকে।

শিশুর মুখে দূর্গন্ধ; Source: FirstCry Parenting

খাবার খাওয়ার পর মুখের ভেতর যে অবশিষ্ট খাদ্য থাকে সেগুলোকে ভেঙ্গে বিশেষ সালফার যৌগে পরিণত করে কিছু ব্যাকটেরিয়া। এসব ব্যাকটেরিয়ার কারণে মুখে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এই দূর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ক্লোরিন ডাইঅক্সাইড সমৃদ্ধ মাউথওয়াশ ব্যবহার করা। এছাড়াও খাদ্যাভ্যাস ও জীবন যাপনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে মুখের দূর্গন্ধ দূর করা যায়।

মুখে দূর্গন্ধ
সৃষ্টির কারণ

শিশুদের মুখে দূর্গন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ঠিকভাবে ব্রাশ না করা এবং ফ্লসিং না করা। মুখের ভেতরে যদি খাদ্যের কনা, টুকরা লেগে থাকে তাহলে সেখান থেকে দূর্গন্ধ বের হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া থাকলেও মুখে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। মুখে দূর্গন্ধ সৃষ্টির আরো যেসব কারণ রয়েছে সেগুলো হলো :

শুষ্ক মুখ

মুখে যদি অপর্যাপ্ত লালা উৎপাদিত হয়, তাহলে জেরোস্টোমিয়া হতে পারে। আর জেরোস্টোমিয়া হলে মুখে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। মুখ পরিষ্কার রাখতে এবং দূর্গন্ধমুক্ত থাকতে লালার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

শিশুর নাকে হাত; Source: Gumsaver

এছাড়া শিশুরা পর্যাপ্ত পরিমাণের পানি পান না করার কারণেও মুখে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর থেকে সকল বিষাক্ত পদার্থ রেচন প্রক্রিয়ায় বের হয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

নাকের পরিবর্তে
মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়া

শিশুরা অনেক
কিছুই বোঝে না। তারা নাক দিয়ে নিঃশ্বাস না নিয়ে কখনো কখনো মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নেয়।
যার ফলে মুখে দূর্গন্ধ সৃষ্টি হয়।

সংক্রমণ জনিত
কারণে

ইনফেকশন ও
সংক্রমণ জনিত কারণে মুখে দূর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আপনার সন্তানের যদি ক্যাভেটিস, মুখে
ব্যথা কিংবা মুখে কোনো ধরনের সার্জারি করানো হয়ে থাকে তাহলে মুখে দূর্গন্ধ সৃষ্টি
হবে। আপনার সন্তানের মুখে দূর্গন্ধ থাকলে আগে নিশ্চিত হন ঠিক কোন কারণে দূর্গন্ধের
উদ্রেক হয়েছে। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।

মুখের দূর্গন্ধ
দূর করার উপায়

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে সহজে মুখের দূর্গন্ধ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। যেমন :

দাঁত মাজা ও ফ্লস
ব্যবহার করা

আপনার সন্তানকে প্রতিদিন দুইবার দাঁত মাজার নির্দেশ প্রদান করুন। সে সঠিকভাবে দাঁত পরিষ্কার করছে কিনা তা তদারকি করুন। তাছাড়া দিনে এক দুইবার ফ্লস ব্যবহার করে দাঁতের গোড়া পরিষ্কার করতে বলুন।

দাঁত মাজা; Source: Today’s Parent

দুপুর ও রাতে বেশি ভারী খাবার খাওয়া হয়। এই দুইবার ফ্লস ব্যবহার করা যেতে পারে। নিয়মিত এই দুইটি অভ্যাসের চর্চা করলে দাঁতে অধিক দূর্গন্ধ সৃষ্টি হবে না।

তাজা সবজি ও ফল

মুখের দূর্গন্ধ
দূর করার জন্য আপনার সন্তানকে মৌসুমী বিভিন্ন ফল খেতে বলুন। মৌসুমী ফলগুলো চিবিয়ে
খেলে শরীরে পুষ্টির যোগান হবে এবং শরীর সুস্থ থাকবে। তাছাড়া ফল ও সবজি খেলে মুখে
স্যালিভা তথা লালার যোগান বাড়ে যার ফলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দূর্বল হয়ে যায়।

চা কিংবা কফি নয়

শিশুদের চা কফি খাওয়া ঠিক নয়। চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে। চায়ের চেয়ে কফি বেশি দূর্গন্ধ সৃষ্টি করে। কফি খেলে জিহ্বার ওপর এক প্রকার প্রলেপ পড়ে যার ফলে অক্সিজেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়ার চলাচল বৃদ্ধি পায়।

চুইংগাম দেবে
সমাধান

আপনার সন্তানের
মুখে যদি দূর্গন্ধ থাকে তাহলে তাকে চুইংগাম খাওয়ার পরামর্শ দিন। চুইংগাম মুখের
দূর্গন্ধ সৃষ্টি ব্যাহত করে। চুইংগাম চিবোলে মুখে অধিক লালা উৎপন্ন হয় এবং ব্যাকটেরিয়া
দূর্বল হয়ে যায়।

সমাধান দেবে দই

দই খেলে হজম
প্রক্রিয়া ভালো হয় এবং মুখের দূর্গন্ধ দূর হয়। এমনটাই বলে থাকেন গবেষকরা। দিনে
একবার দই খাওয়া শরীরের জন্য ভালো।

ভিটামিন সি ও ডি
সমৃদ্ধ খাবার

ভিটামিন সি জাতীয়
ফলমূল আপনার সন্তানকে সুস্থ রাখবে। তাছাড়া টক ফল যেমন পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙা,
লেবু, কমলা, মাল্টা ইত্যাদি দাঁতের জন্য উপকারী। এই ফলগুলো খেলে মুখের ব্যাকটেরিয়া
ধ্বংস হবে এবং দূর্গন্ধ দূর হবে। ভিটামিন ডি জাতীয় খাবারও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে
ভূমিকা রাখে। তাই রোজকার খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি ও ডি সমৃদ্ধ ফল রাখুন।

মুখের রোগের
চিকিৎসা

আপনার সন্তানের দাঁত বা মাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা তা আগে পরীক্ষা করে দেখুন।

মুখের রোগের চিকিৎসা; Source: Arizona Department of Health Services, Director’s Blog

তাছাড়া লিভার অথবা কিডনিতে সমস্যা হয়েছে কিনা তাও পরীক্ষা করুন। দীর্ঘদিন লিভারজনিত সমস্যায় ভুগলে মুখে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়।

Featured Image Source: Adelberg-Montalvan Pediatric Dental & Orthodontics

লেখক – Rikta Richi

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here