গল্প শুনতে কে না ভালবাসে? ছোটরা তো গল্প শোনার কথা শুনলে আনন্দে নেচে ওঠে। গল্প শিশুদের এক কল্পনা রাজ্যে নিয়ে যায়, শিশুদের অনেক কিছু ভাবতে শেখায়। সচেতন অভিভাবকরা সবসময় সন্তানদের গল্প শোনাতে ভালবাসেন। কোনো কোনো অভিভাবক সন্তানদের হাতে গল্পের বই তুলে দিতে চান না, আবার গল্প শোনাতে চান না।

কারণ তারা ভাবে অতিরিক্ত গল্পের বই তুলে দিলে তারা পড়াশুনা বাদ দিয়ে গল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তা সঠিক নয়। গল্পের বই পড়ে কিংবা শিক্ষণীয় গল্প শুনে শিশুদের মনে আনন্দের সঞ্চার হয় এবং তারা অনেক কিছু শিখতে পারে। শিশুদের কল্পনাশক্তির বিকাশ, সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে গল্পের বই পড়া ও গল্প শোনার মাধ্যমে। পাতালপুরি ও রূপকথার গল্প শুনে শিশুরা কখনো ভয় পায়, কখনো হাসে আবার কখনো ভাবনার অতল গভীরে ডুবে যায়।

সন্তানদের গল্প শোনানো; Source: SheKnows

ব্যস্ততার কারণে কর্মজীবী বাবা মা তাদের সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। যার ফলে সন্তানরা একাকীত্বের মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠে। তারা সর্বদা একা থাকতে ভালবাসে। তাদের মধ্যে সামাজিক মনোভাব জন্ম লাভ করে না। তাই বাবা মায়ের উচিত শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানদের সময় দেওয়া এবং তাদের সাথে গল্প গুজব করা। নানা শিক্ষণীয় ও কাল্পনিক গল্প বলার মাধ্যমে আপনি আপনার সন্তানদের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে পারেন।

মা ও শিশুদের গল্প পড়া; Source: BBC

ঐতিহাসিক গল্প শুনলে শিশুরা ইতিহাস জানবে, রূপকথার গল্প শুনলে তারা কল্পনা বিলাসী হবে। শিশুদের গল্প শোনানোর পাশাপাশি চট করে কোনো একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতে পারেন তার উত্তর। আপনার সন্তান গল্পটি থেকে কি শিখেছে তা জানতে পারেন। এভাবে সন্তানদের সাথে সম্পর্ক মধুর হওয়ার সাথে সাথে বাড়বে সন্তানের সৃজনশীলতা। সন্তানকে গল্প শোনানোর আরো কিছু উপকারিতা রয়েছে যেমন,

নানা গুণাবলী
বিকশিত হবে

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিশুরা তাদের নিজ ভাষায় গল্প শুনতে ভালবাসে। গল্পের মধ্যে নিহিত থাকে একটি অন্তর্নিহিত ভাব। অর্থবোধক গল্পের মধ্যে দিয়ে শিশু সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিদ্যা ও বুদ্ধি শিখবে। তাছাড়া বেশি বেশি গল্প শুনলে তার শোনার অভ্যাস ভালো হবে এবং শিশুরা স্থিরতা শিখবে।

গল্পের মাঝে লুকিয়ে থাকা মূল অর্থটি যদি শিশুকে একবার বুঝিয়ে দিতে পারেন তাহলে শিশু তা আত্বস্থ করার চেষ্টা করবে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। এছাড়া অতিরিক্ত আবেগ যে জীবনের জন্য ক্ষতিকর তা সম্পর্কেও শিশু জানতে পারবে গল্পের বই পড়ার মাধ্যমে।

সংস্কৃতি জ্ঞান
বিকশিত হবে

শিশুদের যদি সপ্তাহে একদিন সময় করে গল্প শোনান এবং বিভিন্ন ভাষার গল্প শুনিয়ে তাদেরকে মূল অর্থ বুঝিয়ে দেন, তাহলে তারা নিজের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার পাশাপাশি অন্য দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবে।বইয়ের গল্প ছাড়াও আপনি আপনার শৈশব কৈশোরের মজার মজার ঘটনার কথা সন্তানদের বলতে পারেন।

বাবা ও সন্তানের গল্প; Source: parentsplace.jfcs.org

তাছাড়া এমন কোনো ঘটনা তাদের কাছে শেয়ার করুন যেন তারা ঐ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। আপনি যখন ছোট ছিলেন তখনকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। আপনার সন্তানের বেড়ে উঠার সময় ও বাস্তবতা ভিন্ন। তাই আপনার সন্তানকে যখন আপনার শৈশবের গল্প শোনাবেন তখন তারা পূর্বের অনেককিছু সম্পর্কে জানতে পারবে।

শব্দভান্ডার
বৃদ্ধি পাবে

শিশুরা অনুকরণ করে শিখে। আপনি যদি শিশুদের গল্প শোনান তাহলে নিশ্চয় খুব সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় গল্প শোনাবেন। সেই সাথে কিছু সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য শব্দের ব্যবহার করবেন। গল্পের বইয়ে রুচিশীল ও শিশুদের বোঝার উপযোগী শব্দ দিয়ে গল্প লেখা হয়।

শব্দভান্ডার বৃদ্ধিতে ভূমিকা; Source: Friendship Circle

সেসব বই পড়ে এবং গল্প শুনে শিশুরা নিজের ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। গল্প শোনে শোনে তাদের শব্দভান্ডার বৃদ্ধি পায়। উপযুক্ত বাক্যে উপযুক্ত শব্দ বসাতে শেখে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুদের গল্পের বই পড়তে দেওয়া এবং গল্প শোনানো।

শোনার দক্ষতা
বৃদ্ধি পায়

অধিকাংশ শিশুর
অভ্যাস হলো বেশি কথা বলা। শিশুরা শুনতে ভালবাসে না। তারা দুষ্টুমী করতে ও বেশি কথা
বলতে ভালবাসে। আপনি যদি শিশুকে গল্প শোনান তাহলে ধীরে ধীরে তার গল্পের প্রতি আগ্রহ
সৃষ্টি হবে এবং শোনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে কোনো বিষয় বোঝার ক্ষমতাও
বাড়বে।

সৃজনশীলতা ও
কল্পনা শক্তি বাড়ায়

শিশুরা যখন গল্প
শোনে তখন তার মধ্যে কল্পনাশক্তি বেড়ে ওঠে। শোনার সাথে সাথে সে ঘটনাচক্রের একটি ছবি
মনে এঁকে ফেলে। দৃশ্য, প্লট ইত্যাদি সম্পর্কে মনে মনে ভাবে। যার ফলে ধীরে ধীরে তার
কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে এবং সেই সাথে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটতে থাকে।

স্মৃতিশক্তি
ধারালো হয়

আপনার সন্তানকে গল্প শোনানোর মাধ্যমে তার স্মৃতিশক্তির পরিচয় কিংবা মনে রাখার ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারেন। কিছুদিন আগে একটি গল্প শুনিয়ে এবং তার অর্থ বুঝিয়ে দিয়ে, কিছুদিন পর আবার সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন।

শিশুর ভাবনা; Source: greaterlearninglp.com

সে পুরো গল্পটা বুঝে থাকলে নিশ্চয় অনেক দিন পরেও সেটি বলতে পারবে। এভাবে তার সাথে গল্পের ছলে ছলে স্মৃতিশক্তির পরিচয় জানতে পারেন এবং শিশুর মনোযোগ দক্ষতা বাড়াতে পারেন।

প্রাতিষ্ঠানিক
পড়াশুনা আরো সহজ হবে

অনেক বাচ্চারা
শুধুমাত্র পড়া মুখস্ত করে। তারা কোনো কিছু না বুঝেই পাশ করার জন্য পড়ে ফেলে। তবে
আপনার সন্তানের যদি গল্প শোনার মানসিকতা ও অভ্যাস থাকে তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক
পড়াশুনা আরো সহজ হয়ে যাবে। সে যা পড়বে তা বুঝে পড়ার চেষ্টা করবে। যেকোনো জিনিস বা
কঠিন বিষয়কে সুন্দর ভাবে রপ্ত করার চেষ্টা করবে।

যোগাযোগ দক্ষতা
বৃদ্ধি

শিশুরা সাধারণত লাজুক ও নরম হয়। তারা যেকোনো কৌতূহলের জিনিস জিজ্ঞেস করতে ভয় পায়। তবে তাদের যদি গল্প শোনার মানসিকতা, প্রশ্ন করার মানসিকতা থাকে তাহলে তারা বিশ্বাসের সাথে যেকোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারবে। এভাবে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

Featured Image Source: Getting Smart

লেখক – Rikta Richi

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here